জাতীয়

পিঁপড়ার ডিম জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম তাঁর

পিঁপড়ার ডিম জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম তাঁর

স্টাফ রিপোর্টার: পিঁপড়ার ডিম জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম তাঁর পিঁপড়ার ডিম খেতে পছন্দ করে মাছ। তাই বড়শিতে মাছ শিকারের টোপ হিসেবে পিঁপড়ার ডিম কিনে নেন মাছ শিকারিরা। আর এই ডিম বিক্রি করে সংসার চালাচ্ছেন আবুল কাশেম (৪৮)। পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করেই তিনি পাকা বাড়ি করেছেন, ২২ কাঠার মতো জমি কিনেছেন, সন্তানদের করিয়েছেন পড়ালেখা।

আবুল কাশেম ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার বাক্তা ইউনিয়নের বাক্তা মধ্যপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। ১৯৯০ সাল থেকে লাল পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করেন তিনি। যখন এই পেশায় এসেছিলেন, তখন ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করলেও সময়ের ব্যবধানে ডিমের দামও বাড়তে থাকে। বর্তমানে প্রতিদিন এক থেকে পাঁচ কেজি পিঁপড়ার ডিম বিক্রি করতে পারেন। তবে প্রতি বুধবার ও বৃহস্পতিবার ১০ কেজি পর্যন্ত ডিম বিক্রি করতে পারেন তিনি।

বুধবার (২০ নভেম্বর) বিকেলে ময়মনসিংহ নগরের জিরো পয়েন্ট এলাকায় চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিট্রেট আদালতের সামনের সড়কের ফুটপাতে ডালায় পিঁপড়ার ডিম নিয়ে বসে ছিলেন আবুল কাশেম। এসময় দেখা যায়,
বড়শিতে মাছ শিকারিরা আসছেন, চাহিদা মতো ডিম কিনে নিচ্ছেন। প্রতি কেজি পিঁপড়ার ডিম ১ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করছেন তিনি।

সড়কের পাশে খালি অটোরিকশা থামিয়ে পিঁপড়ার ডিম কিনছিলেন ইদ্রিস আলী। কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, মাছ লাল পিঁপড়ার ডিম খেতে খুব পছন্দ করে। এ কারণে পিঁপড়ার ডিম আমার মতো মৎস্যশিকারিদের কাছে জনপ্রিয়। যখন সময় পাই, তখনই নগরের জিরো পয়েন্টে এসে ডিম কিনে নিই। এরপর জেলার তারাকান্দায় বাড়ির পাশের বিলে বড়শিতে মাছ শিকারের টোপ হিসেবে এই ডিম ব্যবহার করি। মাছও টপাটপ গিলতে চেষ্টা করে পড়শিতে আটকে যায়।

জেলার মুক্তাগাছা সদর এলাকা থেকে আদালতপাড়ায় একটি কাজে এসেছিলেন জমির শেখ। ফুটপাত দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পিঁপড়ার ডিম কিনেন। তিনি বলেন, বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করতে আনন্দ পাই। তাই মাঝেমধ্যে ময়মনসিংহ শহরে কাজে আসলে পিঁপড়ার ডিম কিনে নিয়ে যাই। পিঁপড়ার ডিম দিয়ে দ্রুত মাছ শিকার করা যায়।

পিঁপড়ার ডিম বিক্রেতা আবুল কাশেম জানান,
সব পিঁপড়ার ডিম পাওয়া যায় না। এ জন্য প্রয়োজন লাল পিঁপড়ার বাসা। লাল পিঁপড়ার বাসায় মেলে প্রচুর সাদা ডিম। লাল পিঁপড়াগুলোকে স্থানীয়ভাবে ‘মাঞ্জাইল’ পিঁপড়া বলে ডাকা হয়। ঝোপে কিংবা গাছে সবুজ পাতায় গোলাকৃত্তির বাসা বানিয়ে ডিম পাড়ে এ পিঁপড়া। সাধারণত মেহগনি, আম, লিচুসহ দেশি গাছগুলোতে লাল পিঁপড়ার বাসা পাওয়া যায়। বড় বাসায় ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম ডিম পাওয়া যায়। সাধারণত মে থেকে নভেম্বর পর্যন্ত পর্যন্ত পিঁপড়ার ডিম বেশি পাওয়া যায়। একটা লম্বা বাঁশের আগায় নেট বা জাল দিয়ে এক ধরনের ঠোঙা তৈরী করে গ্রামের গাছ থেকে কিংবা জঙ্গলে গিয়ে গাছ খুঁজে খুঁজে পিঁপড়ার বাসা থেকে ডিম সংগ্রহ করতে হয়। ওই ডিম বড়শিতে সৌখিন মৎস্য শিকারীরা মাছ শিকারের জন্য ব্যবহার করে।

তিনি বলেন, দীর্ঘ ৩৪ বছর ধরে এই পিঁপড়ার ডিমই আমার জীবিকা নির্বাহের একমাত্র মাধ্যম। ডিম বিক্রি করে ভালোভাবেই সংসার চলছে। লাভের টাকায় বড় ছেলেকে এইচএসসি পাশ করিয়েছি। সে এখন একটি কোম্পানিতে চাকরি করছে। দুই মেয়ে স্থানীয় মহিলা মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছে।

আবুল কাশেম বলেন, দিন দিন গাছের সংখ্যা কমছে। ফলে আগের মতো পিঁপড়ার ডিম পাওয়া যায় না। এজন্য পিঁপড়ার ডিম বিক্রির সঙ্গে জড়িত অনেকেই এ পেশা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। তবে ডিমের ক্রেতার অভাব নেই। বর্ষায় পানি বাড়লে কিংবা বন্যা হলে পিঁপড়ার ডিমের চাহিদা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তখন বিক্রি হয় কয়েকগুণ বেশি। এ পেশা টিকিয়ে রাখতে গ্রামসহ বনাঞ্চলে বেশি করে গাছ লাগানো প্রয়োজন। তাহলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হওয়ার পাশাপাশি চাহিদার তুলনায় বাড়বে পিঁপড়ার ডিমের সংখ্যাও।

ময়মনসিংহের পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট শিব্বির আহমেদ লিটন বলেন, গাছের মগ ডালের পিঁপড়ার ডিম বা পিঁপড়া বনের পাখ-পাখালির খাদ্য। পিঁপড়াসহ ডিম সংগ্রহের মাধ্যমে পাখ-পাখালির খাদ্য ঘাটতি হলে পাখিদের অস্তিব সংকট দেখা দিতে পারে। তবে জীবিকার তাগিদেই অনেকে পিঁপড়ার ডিম সংগ্রহ করছেন। তবে পরিবেশ ঠিক রাখতে হলে বেশি করে গাছ লাগাতে হবে। বন উজাড় করা যাবে না। গাছ-গাছালি কমানো হলে পিঁপড়াসহ প্রকৃতি বা জীববৈচিত্র হুমকির মুখে পড়বে।

এ বিষয়ে ময়মনসিংহের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আ ন ম আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, বিভিন্ন সময় সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী ফলদ ও বনজ গাছ লাগানো হচ্ছে। বাড়ির আশপাশে সকলেরই বেশি করে গাছ লাগানো উচিত।