উপ-সম্পাদকীয়

ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে শালবন, অস্তিত্ব সঙ্কটে বন্যপ্রাণীরা হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য

শালবন মানেই ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল এবং গাজীপুর জেলার বিশাল বনভূমির কথা মনে করিয়ে দেয়। মূলত শাল গাছের আধিক্যের কারনেই এই বনভূমির নাম হয়েছে শালবন। এই শালবনকে ঘিড়ে বসবাস ছিল প্রচুরসংখ্যাক বন্যপ্রাণীর। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং বাস্তুসংস্থানেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে এই বন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বনভূমি উজাড়, কৃষি জমি ও বসতবাড়ি তৈরীর ফলে দিন দিন বনভূমির পরিমাণ কমে আসছে এবং বন্যপ্রাণীও বিলুপ্ত হতে শুরু করেছে।

একটা সময়ে এই শালবনে বাঘ, হরিণ, অজগর সাপ, শকুন, হনুমান, কাঠবিড়ালি, লঙ্গর সহ বিভিন্ন প্রাণীর বসবাস ছিল কিন্তু এখন কিছু বানর আর কয়েক প্রজাতির পাখি ছাড়া আর তেমন কোন বন্য প্রাণীর দেখা মিলেনা। বন্যপ্রাণীর খাবারের ঘাটতি হওয়ায় সেগুলো আজ বিলুপ্ত। খাবারের সংস্থানে লোকালয়ে গিয়ে ধরা পড়ে স্থানীয় জনগণের আঘাতে মৃত্যুবরন করার ঘটনাও ঘটেছে বহুবার।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান এর শালবনের জীববৈচিত্র সংক্রান্ত এক গবেষণা প্রতিবেদন হতে জানা যায়, বর্তমানে এই বনে ২১ প্রজাতির বৃক্ষ এবং ১৭ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে যাদের মাঝে ৯টি পাখি, ২টি সরিসৃপ, ৩টি উভচর এবং ৩টি স্তন্যপায়ী প্রাণী। পত্রঝড়া শাল গাছ ছাড়াও অর্জুন, বহেরা, হরতকি, চাপালিশ, কড়ই, শিমুল প্রভৃতি গাছের দেখা মিলে এই শালবনে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০ সালে এই শালবনের আয়তন ছিল ২৩ হাজার ৬৫০ হেক্টর। ২০১৫ সালে এই বনভূমি হ্রাস পেয়ে ১৭ হাজার ৪৯ হেক্টরে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই আয়তনের সঠিক পরিমাণ জানা না গেলেও এই আয়তন পূর্বের চে অনেকটা কমেছে এটা নিশ্চিত ভাবে বলা যায়। কেননা অতীতে একটা সময় ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা যাবার পথে ত্রিশাল পার হবার পর থেকে বনের দেখা মিলতো। আর সেই বন এখন ত্রিশাল তো দূরের কথা ভালুকা, শ্রীপুর পার হয়ে রাজেন্দ্রপুর পর্যন্ত গেলেও দেখা মিলেনা। যা একটু দেখা পাওয়া যায় সেটা সরকারিভাবে সংরক্ষিত ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানে। এমনকি মূল সড়ক থেকে অলি গলিতে ঢুকলেও বনের আধিক্য খুব একটা চোখে পড়েনা। সেখানে শুধুই কলকারখানা আর বসতির আধিক্য। অথচ ৮-১০ বছর আগেও সেসব এলাকা বনের গাছে ভরপুর ছিল।

শিল্পায়নের স্রোতে দিন দিন উজাড় হচ্ছে ভালুকার সংরক্ষিত শালবন। এতে করে উদ্বেগ বাড়ছে বন্যপ্রাণী, জীববৈচিত্র ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়। গত বছরও ময়মনসিংহের ভালুকায় সংরক্ষিত শালবনে ৫ শতাধিক গাছ কেটে বন উজার করেছে ভুমিদস্যুরা। বনভূমির জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বেশ কিছু স্থাপনা। দিন দিন বনের আয়তন কমে যাওয়ায় অস্তিত্ব সঙ্কটে বন্যপ্রাণীরা।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গাছ কেটে সাবাড় করে গহীন অরন্যকে বিরানভূমিতে পরিণত করছে বনদস্যুরা। আবাস হারিয়ে অসহায় বানরের দল, দুর্বৃত্তের থাবায় তারা আজ অস্তিত্ব সঙ্কটে। কিছুতেই যেন থামছেনা তাদের নির্বাক আর্তনাদ। ময়মনসিংহের ভালুকার হবিরবাড়ি এলাকার শালবন বিলীনের ফলে হুমকির মুখে বৃক্ষরাজি এবং ইকোসিস্টেম। বন্যপ্রাণীরাও ভুগছে খাদ্যসঙ্কটে। বিভিন্ন কৌশলে বন উজাড় করে দখলের পায়তারা করছে প্রভাবশালী মহল। এই সংরক্ষিত বনের শাল, গজারি ও আকাশমনি গাছ কেটে নিচ্ছে বনখেকোরা। শুধু গাছ কেটেই নয়, আগুন জ্বালিয়ে সেই সঙ্কট আরও ভয়াবহ খারাপের দিকে ঠেলে দিচ্ছে দুর্বৃত্তরা।

এলাকাবাসী ও বন বিভাগের সূত্রে জানা যায়, ভালুকা উপজেলার হবিরবাড়ি মৌজায় রাধুর ভিটার বনের গেজেটভূক্ত ৪১৩ ও ৪৩৮ নং দাগের অর্ধশত বছরের পুরনো গজারি ও আকাশমনি গাছের বাগান থেকে ৫ শতাধিক গাছ দুর্বৃত্তরা কেটে নিয়ে ফেলায় পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জীববৈচিত্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। গাছগুলো কেটে নেয়ার পর গাছের অস্তিত্ব ধ্বংস করার জন্য সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ অভিনব কায়দায় বন ধংস করে হবিরবাড়ি এলাকার সরকারী বনভূমির জাল কাগজপত্র তৈরি করে কয়েক হাজার একর বনের দখল করে নিয়ে ঢাকার বিভিন্ন শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয় দালালরা।

বনাঞ্চলের ভেতরে এবং বন সংলগ্ন এলাকাতে বেশ কয়েকটি করাতকল এবং ইটভাটা রয়েছে। এগুলোর কোনটিরই অনুমোদন বা সঠিক কোন ছাড়পত্র নেই তারপরও দিনের পর দিন গাছ ও কাঠ চিড়াই হচ্ছে এসব করাতকল থেকে। আর ইটভাটায় পোড়ানো হয় বনের কাঠ। অভিযোগ রয়েছে এসব করাতকলে ও ইটভাটায় বনের গাছ ব্যবহারের। এমনকি বনের ভেতর কাঠকয়লা উৎপাদনের জন্য একাধিক চুল্লী বানানোর ইতিহাসও রয়েছে। কদাচিৎ ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে এগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হলেও পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হয়নি।

তবে বন উজারের পেছনে বনবিভাগ কর্তৃপক্ষের গাফিলতিকে দুষছেন পরিবেশবাদীরা। পরিবেশ রক্ষা উন্নয়ন আন্দোলন (পরউআ) সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ ড. শাহাব উদ্দিন আহমেদ বলেন এভাবে চলতে থাকলে বন হারিয়ে যাবে, জীববৈচিত্র ধ্বংস হবে এবং দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে পরিবেশ বিপর্যয় ঘটবে। বনকে রক্ষা করতে হলে আইনের সঠিক প্রয়োগ ঘটাতে হবে এবং বনবিভাগের জনবল ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

তবে বন কর্মকর্তার দাবি আইনী জটিলতায় বন দখলের অপচেষ্টা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ভালুকা রেঞ্জের ফরেস্ট বিট অফিসার আশরাফুল আলম খান জানান, ভূমি দস্যুরা হাইকোর্ট থেকে রিট এনে সেই জমি দখলের পায়তারা করে তাই ইচ্ছা থাকা সত্বেও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া যায়না। বনপ্রহরীরা বনের জমি পুনরুদ্ধারে গেলে স্থানীয়দের বাধা ও হামলার শিকার হতে হয়। যদিও বন রক্ষায় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সাথে সমন্বয় করে বন দখল প্রতিরোধের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

বনবিভাগ কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে বন আদালতে ভালুকা উপজেলার ৯৫টি সহ পুরো ময়মনসিংহ জেলায় দুই শতাধিক মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ফুলবাড়িয়া উপজেলায় সন্তোষপুর গ্রাম তো মামলার গ্রাম নামেই অভিহিত। কারন এই গ্রামের সকল পুরুষের নামে বন আদালতে মামলা রয়েছে। এসব মামলার অধিকাংশ আসামীরাই ধরাছোঁয়ার বাইরে। সাফল্য বলতে মুক্তাগাছার চিহ্নিত বনদস্যু রজব আলীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার নামে বন সংক্রান্ত বিভিন্ন অপরাধে ৯টি মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল।

বন সংরক্ষণের বিষয়ে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বলেন, বনের সুরক্ষায় তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। বন আদালতে মামলা করা হলেও দীর্ঘসূত্রিতার জন্য আসামিরা পার পেয়ে যায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে হাইকোর্টের নির্দেশনা মানতে গিয়ে অবৈধভাবে দখলকৃত বনের মালিকানা পুনরুদ্ধারে বিলম্ব হয়। এছাড়া সুফল প্রকল্পের আওতায় বৃক্ষরোপণ করে বনাঞ্চলের গাছের সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি বন্যপ্রাণীর খাদ্য সংস্থানে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে বনবিভাগের মাধ্যমে।

আর জেলা প্রশাসক মো. মফিদুল আলম জানান, অবৈধ দখল রোধে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।

পরিবেশের ভারসম্য রক্ষার কথা চিন্তা করে বনের হারানো গৌরব ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়াটা জরুরি। তা না হলে যেটুকু আছে সেটুকুও বনখেকোদের করালগ্রাস থেকে আগামীতে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে যাবে। এজন্য প্রয়োজন আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সকল অনিয়ম অগ্রাহ্য করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ। তবেই পাতার সবুজ হাসিতে হেসে উঠবে সমগ্র শালবন, বন্যপ্রাণীদের এলোমেলো ছুটোছুটিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে বনের চারপাশ। সেই কার্বন দূষণ কমার পাশাপাশি বায়ুর মানে উন্নতি ঘটবে আমাদের আবহাওয়ায়। নির্মল সতেজ অক্সিজেনে নেয়া যাবে প্রাণভর নিশ্বাস।

জগলুল পাশা রুশো
লেখক- গণমাধ্যমকর্মী